ধরা যাক, আপনার প্রিয় মানুষটির মন খারাপ। কারণটা হয়তো আপনাকে বলবে। তবে সে নিজেকে গুছিয়ে নিতে একটু সময় নিচ্ছে। আপনি আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। দশ বারোটা প্রশ্ন করে আপনার পন্ডিত মন বুঝে নিলো যে এটা অতি অবশ্য ডিপ্রেশন না হয়ে পারেই না। একটু সময় নেয়া যাক। আপনার ঘনিষ্ট মানুষটির মধ্যে আসলেই কি কোন হতাশার উপসর্গ আছে? হতাশার উপসর্গগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা আছে আমাদের? আসুন হতাশা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। তারপর সিধান্ত নেয়া যাবে।

 

হতাশা বা ডিপ্রেশন:

হতাশা কোন দীর্ঘস্থায়ী (static illness) অসুস্থতা নয়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যদি সবকিছুতে আগ্রহের ঘাটতি বা আনন্দদায়ক কোন কিছুতে অংশগ্রহণ না করে তাহলে চিন্তিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আবার দুই সপ্তাহ ধরে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি একই মানসিক অবস্থায় নাও থাকতে পারেন। ১৪-১৫ দিনের মধ্যে দুই তিনদিন আনন্দে বা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। ডিপ্রেশ ব্যক্তিও আবুল ভাইয়ের টংয়ের দোকানে বসে দুধ চায়ের সাথে গোল্ডলিফ টেনে লইট্টা মাছের শুটকি কিনে এনে রান্না বসাইতে পারেন। তাহলে বুঝবেন কীভাবে? দুই তিনদিন পর আবার তিনি কোন কিছুতেই আগ্রহ পাবেন না। তাহলে কী দাঁড়ালো? ১৪-১৫ দিনের মধ্যে মুড সুইং হতেই পারে। তাহলে আশংকা নাই হয়ে যাচ্ছে না। বরং হতাশার উপসর্গগুলো খুব ভালোভাবে লক্ষ করতে হবে। তো হতাশার সেই উপসর্গগুলো কী কী?

 হতাশার উপসর্গ:

১। দুঃখী মনোভাব, আশাহীন কান্নাভাবাপন্ন অভিব্যক্তি।

২। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন বা অনীহা এতে ওজন কমতে বা বাড়তেও পারে।

৩। প্রচুর বা খুব অল্প ঘুম হবে তবে কমবেশি যাইহোক ঘুম নির্ঝঞ্ঝাট বা সাউন্ডস্লিপ হবে না।

৪। প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে অনীহা দেখা দেবে।

৫। অবসাদ দেখা দেবে। সামান্য একটা কাজ করতেও অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে দেখা যায়।

৬। সামান্য কারনেও খুব রেগে যেতে পারেন। এমনকি কারণ ছাড়াও রাগারাগি করতে পারেন।

৭। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেকে কারণে অকারণে অপরাধী ভাবেন। অতীতে ঘটে যাওয়া কোন কারণে নিজেকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।

৮। মনযোগ দিতে, সিদ্ধান্ত নিতে এমনকি কথা বলতেও তাদের অসুবিধা হয়।

৯। ঘনঘন মৃত্যুচিন্তা বা আত্মহত্যার চিন্তা করতে দেখা যায়।

১০। শারীরিক অসুবিধার কথা বলেন কিন্তু নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেন না। অসুবিধা ব্যাখ্যাও করতে পারেন না।

 

এবার সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এখন যদি মনে হয় আপনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিটি হতাশাগ্রস্ত তাহলে তাকে তার রোগটি বুঝে উঠতে সহায়তা করুন। হতাশার উপসর্গ ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে। আপনি হতাশা বিষয়ক পড়াশোনা অব্যাহত রাখুন তবে সোশ্যাল কাউন্সিলর বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন। তিনি/তারা হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কেস-স্টাডি করে বা না করে আপনার করণীয় বা বর্জনীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিবেন। না আপনার কাজ শেষ হয়নি। আপনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিটিকে খোলা প্রশ (open-ended) করে তার কথা সমানুভূতি (sympathy) নিয়ে শুনুন। আর ঘনিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিটির সম্পর্কে স্মল ডিটেইল জানতে চাইতে পারেন সোশ্যাল কাউন্সিলর। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনি প্রস্তুত তো?

 

চিকিৎসা গ্রহনের জন্য প্রস্তুতি:

 

বেশি সংখ্যক হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে হতাশার উপসর্গ তীব্র। এটা তাদের প্রাত্যহিক কাজকর্ম লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন। তবে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে উপসর্গ দেখিয়ে দিলেও সেটি সাধারণত মানতে চাইবেন না। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন এমনকি আপনি তার খুব প্রিয় ব্যক্তি হলেও। আর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কীয় না হলে আমরা প্রায়ই লক্ষই করতে পারি না যে ব্যক্তিটি কোন সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রায়শই বিশাদগ্রস্থ ব্যক্তি তার প্রিয়জনরা ভাবেন কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই আরোগ্য লাভ করা যাবে। এটা খুব ভুল ধারণা। আপনার প্রিয়জনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন এবং চিকিৎসা চলার পুরো সময়টা জুড়ে তাকে (পরামর্শ অনুযায়ী) সহযোগিতা করতে হতে পারে।

 

চিকিৎসা শুরুর আগে পরে আপনার করণীয়:  

* আপনি যে সকল উপসর্গ লক্ষ করেছেন সেগুলো আপনার প্রিয় ব্যক্তিটির সাথে আলাপ করুন

* আপনার উদ্বেগ প্রকাশ করুন

* সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিন। (রোগী এবং কাউন্সিলরের সাথে আলাপ করে এ্যাপয়েমেন্ট নিন)

* চিকিৎসার প্রকারভেদ বিস্তারিত আলাপ করুন (সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং, মেডিকেশন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা দিন)

 

আরামদায়ক বাসস্থানের ব্যবস্থা:

 

হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তির উন্নত জীবন যাপন তার সুস্থ হওয়ার পক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ডিপ্রেশন সাধারণ একটা মানসিক রোগ। এটা কোন বিশেষ 'ভুল' বা ব্যক্তি বা অন্যকোন ব্যক্তির কারণে যেভাবেই ঘটুক না কেন তা নিয়ে গুঞ্জন সৃষ্টি না করাটা সাধারণ ভদ্রোচিত বিষয়। হতাশা চলাকালীন সময়ে জীবন যাপনে ছন্দপতন ঘটতে পারে বা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। কারণ হতাশা ব্যক্তির জীবনীশক্তি কমিয়ে দেয়ার সাথে সাথে ঘুম এবং ক্ষুধার বিপর্যয় ঘটিয়ে থাকে।

 

দ্রুত আরোগ্যে লাভের জন্য করণীয়:

 

* স্বাস্থসম্মত খবাবের ওপর গুরুত্ব দিন। তাকে খাবার নির্বাচন রান্নার সাথে যুক্ত করুন বা আপনি তার সাথে অংশগ্রহণ করুন

*একসাথে ব্যায়াম করুন। একসাথে সাইকেল চালান, দৌড়াতে, বেড়াতে নিয়ে যান

* সাইকোথেরাপিতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক্সস্টেড ফিল করেন। সময়ে তাকে পর্যাপ্ত সময় দিন

* বসস্থান থেকে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয় এমন ইস্টিমুলেশন সরিয়ে ফেলুন। সেটি সম্ভব না হলে বাসস্থান পরিবর্তন করা যেতে পারে

* বিভিন্ন আনন্দদায়ক কর্মসূচি আলাপ করে ঠিক করুন। ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও সিডিউল খুব প্রয়োজন না হলে পরিবর্তন করবেন না

*হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির বিদ্যমান দক্ষতার প্রসংশা করে আরো দক্ষতা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে

আত্মহত্যার উপসর্গ জেনে রাখুন:

 

খুব হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি হঠাৎ করেই আত্মহত্যা করে বসতে পারেন তাই অপমৃত্যু রোধ করতে আত্মহত্যার উপসর্গগুলো মনে রাখুন। কোন একটি লক্ষন দেখা দিলে দ্রুততার সাথে সমাজকর্মী/মনোবিজ্ঞানী বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

 

আত্মহত্যার উপসর্গ সমূহ:

 

* আত্মহত্যা নিয়ে আলাপ করলে

* আত্মহত্যা করা যায় এমন অস্ত্র বা ঐষধ সংরক্ষণ করলে

* সাধারণ সামাজিক কর্মকান্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেললে

* খুব বেশি মুড সুইং হতে থাকলে

* হঠাৎ দান করতে শুরু করলে (আমি এইসব দিয়ে কী করবো? আমার কোন কিছুর দরকার নেই এই জাতীয় প্রবনতা দেখা দিলে)

 

মনে রাখা দরকার, মন কিন্তু বায়বীয় কোন সত্ত্বা নয়। মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রে হরমোন অন্যান্য স্টিমুলাসের কারনে মানসিক রোগের সৃষ্টি হয়। সুতরাং শরীরের রোগের চেয়ে মানসিক রোগকে কোনভাবেই কম গুরুত্বের সাথে দেখার সুযোগ নেই। বরং বেশিই গুরুত্ব দিন।