কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো- ক্ষমতার রক্ষার্থে তার ‘অধীনস্ত’ জনগণের ওপর প্রবল নিয়ন্ত্রণারোপ; হোক তা প্রকাশ্যে ও জোরপূর্বক, কিংবা গোপনে নজরদারির মাধ্যমে দমন। আগের দিনে রাজা-রাজরারা তাদের সাম্রাজ্য ‘বিস্তার ও সুরক্ষা’র জন্য দূত পাঠাতো দেশে দেশে বা নিজ সীমানার মধ্যেও ‘স্পাইং’ করতো, এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতো- মানে দমন করতো। হাজার বছর ধরে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে মানুষের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ওই দমন-পীড়ণ থেমেছে, কিংবা বলা ভালো- প্রশমিত হয়েছে; বিপরীতে হাজির হয়েছে ‘মানবাধিকার’, ‘মানবাধিকার রক্ষার্থে আইন’, ‘চুক্তি-কনভেনশান-সমঝোতা’ ইত্যাদি। একপর্যায়ে গঠিত হয়েছে জাতিসংঘ, ঘোষিত হয়েছে সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ। যার মধ্যে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি), ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলোকে স্বীকার করা হয় এবং সেগুলো রক্ষা করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত হয়। প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোই এসব ক্ষেত্রে উদোক্তার ভূমিকায় ছিলো। কিছুমাত্রায় চর্চাও হয় দেশে দেশে। বিপরীতভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনের স্বার্থে নাগরিকদের ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ নষ্ট করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিত্য নতুন কৌশলও সামনে এসেছে।
বহুল আলোচিত ‘প্যাগাসাস স্পাইওয়্যার’ এমনই এক ভয়ংকর অস্ত্র। যেটা ইসরাইলের সফটওয়্যার ফার্ম এনএসও তৈরি করেছে, এবং সেটা বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছে। এই স্পাইওয়্যার ইসরাইলকে শুধু বিপুল অর্থ আর তথ্যের প্রবাহই দিচ্ছে না, দিচ্ছে কুটনৈতিক সুবিধাও। দখলদার হিসেবে কুখ্যাত ইসরাইল বহু বছর ধরেই বৈধতার সংকটে ছিলো। এই প্যাগাসাস তাকে সেই সংকট সমাধানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে নতুন করে। আরব দেশগুলোসহ অন্যান্য ক্রেতাদের সাথে স্বার্থের সম্পর্কে জড়িয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চাইছে ইসরাইল।
গ্রীক কল্পকাহিনীর ডানাযুক্ত ঘোড়া প্যাগাসাস যেমন যেখানে সেখানে অবাধে বিচরণ করতে পারতো, তেমনি এই পেগাসাস স্পাইওয়্যারও দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তের যেকোনো টার্গেটেড ফোনে ঢুকে ওই ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে শুধুমাত্র একটি উড়ো টেক্সট মেসেজ বা ফোন কলের মাধ্যমেই। মোবাইল ব্যবহারকারী টেক্সটি ওপেন করলে কিংবা ফোন কলটি রিসিভ করলেই পেগাসাস সয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইলটিতে ইন্সটল হয়ে যায়। এনএসও এখন এই স্পাইওয়্যারকে আরো শক্তিশালী করেছে। এখন এটা ফোনে ইন্সটল হতে আর ক্লিক করারও প্রয়োজন হয় না, ফোনে ইন্সটলকৃত যেকোন সফটওয়্যারের ত্রুটি ব্যবহার করেই এটি এখন যেকারো ফোনে ঢুকে পরতে পারে।
২০১৯ সালে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত অনলাইন মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের ত্রুটির সুযোগ নিয়ে এনএসওর সফটওয়্যার ১৪০০ ফোনে ম্যালওয়ার পাঠিয়েছিল। সেজন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে শুধু একটি কল করেই ওই ফোন ব্যবহারকারীর অজান্তেই পেগাসাসের কোড ফোনে ইনস্টল হয়ে যায়। এবং ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আক্রমণকারী বা হ্যাকারের কাছে। ফোনের ভেতরে ম্যাসেজ, ছবি, ভিডিও, কন্টাক্ট নাম্বার, লোকেশান সবকিছুই জানতে পারে হ্যাকার। এমনকি ফোন কলে হওয়া কথোপকথন রেকর্ড করা, ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে গোপনে ভিডিও ধারণ করা, এমনকি ফোনের মাইক্রোফোনকে ব্যবহার করে সামনাসামনি কোনো ব্যক্তির সাথে আপনার কথোপকথনও রেকর্ড করে পাঠিয়ে দিতে পারে এটি।
যদিও প্যাগাসাস নির্মাতা ইসরাইলের এনএসও গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনের তথ্য হাতিয়ে নিতে এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হয় না। শুধু সন্দেহভাজন অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর এটা দিয়ে নজরদারি করা হয়েছে।
সম্প্রতি বৃটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াশিংটন পোষ্টসহ ১৭টি সংবাদমাধ্যমের একটি সমন্বিত কনসোর্টিয়াম একযোগে প্রকাশ করেছে যে- ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে বিশ্বের ১৮০ সাংবাদিকের স্মার্টফোনে আড়ি পাতা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ৫০টিরও বেশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে আড়ি পাতা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত দেশগুলোর সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে। আজারবাইজান, বাহরাইন, মরোক্কো, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হাঙ্গেরি, কাজাকিন্তান, মেক্সিকো, রুয়ান্ডা, ও ভারতের নাম তালিকায় বাংলাদেশের নাম আছে কিনা নিশ্চিত তথ্য নেই। যদিও ওয়াশিংটন পোষ্টে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে প্যাগাসাসের ক্রেতা হিসেবে।
লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ এবং প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক সংবাদ সংস্থা ‘ফরবিডেন স্টোরিজ’ প্রথম এ তথ্য পায়। পরে ১৭টি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করা হয়।
এসব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, স্মার্টফোনে আড়ি পাতা সাংবাদিকের তালিকায় বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক, অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা রয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, আল–জাজিরা, ফ্রান্স ২৪, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, মিডিয়াপার্ট, অ্যাসোসিয়েট প্রেস-এপি, ব্লুমবার্গ, এএফপি, ইকোনমিস্ট, রয়টার্স, ভয়েস অব আমেরিকাসহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও আছেন এই তালিকায়। তারমানে দেখা যাচ্ছে- এই স্পাইওয়্যার দিয়ে মূলত তাদেরকেই নজরদারির মধ্যে আনা হচ্ছে, যারা ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, গণবিরোধী কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করে ও তা নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। যেমন এই তালিকায় আছেন আমেরিকান অনুসন্ধানী সাংবাদিক ব্রাডলি হোপ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে যখন তিনি কাজ করতেন তখন তাঁর ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল। ব্রাডলি হোপ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের আলোচিত ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি ও এর সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন।
এছাড়াও প্রখ্যাত সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার আগে ও পরে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মুঠোফোনেও আড়ি পাতা হয়েছিল। এই কাজ করার জন্যেও ব্যবহার করা হয়েছিল ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপের তৈরি পেগাসাস নামের সফটওয়্যার।
কোন কোন দেশে এবং কাদের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিস্তারিত না বললেও অনুসন্ধান দলে থাকা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ওয়্যার’ তাদের দেশে সম্ভাব্য নজরদারির তালিকায় থাকা বেশ কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণ ও পানিসম্পদ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রতিমন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতার দল তৃণমূলের পক্ষে নির্বাচনী পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রশান্ত কিশোরের নাম রয়েছে এ তালিকায়। এছাড়াও ৪০ জন সাংবাদিকসহ ৩০০ ফোন নম্বর ওয়্যারের হাতে এসেছে।
তালিকায় থাকা রোহিনী সিং, যিনি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ ও ব্যবসায়ী নিখিল মার্চেন্টের ব্যবসা নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নিখিল। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সন্দেহজনক লেনদেন নিয়েও অনুসন্ধান করেছিলেন রোহিনী সিং। আরেক সাংবাদিক সুশান্ত সিংয় বিতর্কিত রাফাল যুদ্ধবিমান কেনায় সম্ভাব্য দুর্নীতির অনুসন্ধান করছিলেন। বিভিন্ন দেশের এরকম অসংখ্য নাগরিকের ফোনে হয়তো আড়ি পাতা হচ্ছে, সামনে হয়তো সেগুলোও উদাহরণ হিসেবে দেয়া যাবে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা, হোক তিনি সাংবাদিক কিংবা মানবাধিকার কর্মী বা বিরোধী রাজনৈতিক নেতা- তারা (দৃশ্যত) প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার সাথে যুক্তদের প্রতিপক্ষ বা তাদের কর্তৃত্বদাবি শাসনের জন্য বাঁধা। সুতরাং একথা বলাই যায় যে, প্যাগাসাস স্পাইওয়্যার ক্রয় করা এনএসও’র ক্লায়েন্ট দেশ বা গ্রুপগুলো তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রক্ষার স্বার্থেই ওই স্পাইওয়্যার ক্রয় করেছে ও ব্যবহার করছে।
গণতন্ত্রের শাসনের সাথে প্যাগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে নাগরিকদের নজরদারির মধ্যে রেখে তাদের কণ্ঠরোধ করা ও দমন করা কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যতোই তাকে বলা হোক- সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর জন্য। আমরা তো দেখেছি- সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে কী হয়েছে বা হচ্ছে। আমরা তো দেখেছি- গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়ার ভুয়া খবর ছড়িয়ে ইরাকে কী করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আমরা দেখি নিরাপত্তার কথা বলে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’সহ আরো আরো কতো কী ভয়ংকর আইন তৈরি করা হয়! এসবই জনগণের টাকায় জনগণের ওপর নিষ্পেষণ চালানোর কৌশল মাত্র। নাগরিকের স্বাধীন ও ভয়হীন মতামতকে সবসময়ই কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা ভয় পায়। তখনই তারা গোপন-অন্যায্য পন্থা বেছে নেয়।
গণতান্ত্রিক দেশে/সমাজে ব্যক্তির ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ বা প্রাইভেসি রক্ষিত হবে- এটাই কাম্য। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় ও তথ্য প্রযুক্তির যুগে যেটা খুবই বড় একটা চ্যালেঞ্জ। পুঁজি তার ব্যবসার প্রসারের স্বার্থে নাগরিকের রুচি, ভালো লাগা-মন্দ লাগা, ইচ্ছা-অভিপ্রায়, আবেগ সকল কিছুতেই তার লোভের থাবা বসিয়েছে। নাগরিকের এইসব একান্ত ‘ব্যক্তিগত’ পছন্দ-অপছন্দগুলোর তথ্য চালান হয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের হাতে, তাদের মার্কেটিং পলিসি নির্ধারণের ডাটা হিসেবে। একজন নাগরিক তার অজান্তেই নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যা মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকারের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্যাগাসাসের মতো স্পাইওয়্যারগুলো মানুষের ইতোমধ্যেই দুর্বিষহ ও অনিরাপদ হয়ে ওঠা জীবনকে আরো ভয়ংকর করে তুলবে। সুতরাং সম্মিলিত আওয়াজ ওঠা দরকার দুনিয়ার সকল প্রান্তের মুক্তিকামী মানুষের। সোচ্চার আওয়াজ দরকার প্যাগাসাস স্পাইওয়্যারের মতো ভয়ংকর অস্ত্রের নির্মাতা-বিক্রেতা-ক্রেতা-পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে।
সৈকত মল্লিক
রাজনীতিক ও প্রাবন্ধিক

0 Comments